বিশ্বব্যাপী ডলারাইজেশন ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ও জোটগত মেরুকরণের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ও জোটগত মেরুকরণের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের অর্থনৈতিক বলয় ক্রমবর্ধমান হারে সম্প্রসারণ হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে ডলারাইজেশন বা ডলারকে বিভিন্ন দেশ যাতে প্রধান মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করে তেমন কৌশল নির্ধারণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর এফটি।

ডলারাইজেশন প্রক্রিয়ায় একটি দেশ নিজস্ব মুদ্রার পরিবর্তে বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে মার্কিন ডলারকে গ্রহণ করে। এতে স্থানীয় মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা কমে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে। এতে অবশ্য ঝুঁকি রয়েছে। কারণ তখন ডলারাইজেশন কার্যকর করা দেশটিকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থনীতিতে নিজেদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

গত আগস্টে ডলারাইজেশন বিষয়ক গবেষক ও জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ হাঙ্কের সঙ্গে দুই দফায় বৈঠক করেছেন মার্কিন অর্থ বিভাগ ও হোয়াইট হাউজসহ বিভিন্ন সরকারি বিভাগের কর্মীরা। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল ডলারাইজেশনকে কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারণ।

স্টিভস হাঙ্ক বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন ডলারাইজেশনকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

এমন সময়ে ডলারাইজেশন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে যখন আর্জেন্টিনার মুদ্রা সংকট কাটাতে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কিছু নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদের মতে, ডলারাইজেশনের জন্য অগ্রগণ্য দেশ হতে পারে আর্জেন্টিনা। কারণ দেশটির মুদ্রা পেসো বারবার আস্থাহীনতার শিকার হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখনো বিবেচনায় আনা হয়নি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনা উভয় দেশই।

উদীয়মান বাজারগুলোয় আন্তঃসীমান্ত লেনদেনে বেইজিংয়ের উদ্যোগ বাড়ছে। এতে ডলারের ব্যবহার কমে যেতে পারে এমন আশঙ্কা মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশে। স্টিভস হাঙ্ক বলেন, ‘এক বৈঠকে হোয়াইট হাউজসংশ্লিষ্ট এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এ ধরনের উদ্বেগ তুলে ধরেছিলেন।’

স্টেবলকয়েন বিষয়ে এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন শিথিল নীতি প্রণয়ন করেছে। এখন ডলারাইজেশন নীতির সঙ্গে ডলার-ভিত্তিক স্টেবলকয়েন ব্যবহার প্রসারিত করার বিষয়ে ভাবছে তারা।

স্টিভস হাঙ্কের সঙ্গে বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছেন হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র কুশ দেশাই। তবে জোর দিয়ে এও বলছেন, সরকার ডলারাইজেশনকে উৎসাহিত করবে কিনা এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

তিনি বলেন, ‘ডলারের শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়ের মতো এ বিষয়েও নিয়মিত বাইরের বিশেষজ্ঞদের মতামত নিচ্ছে প্রশাসন। তবে বৈঠক ও মতামতকে সরকারি নীতি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।’

আর্জেন্টিনার জন্য সাম্প্রতিক ২০ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা ঘোষণার আগেই ডলারাইজেশন বিষয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্টিভস হাঙ্ক জানান, ডলারাইজেশনের প্রার্থী হিসেবে লাতিন আমেরিকার দেশটি এগিয়ে থাকবে। এর পাশাপাশি লেবানন, পাকিস্তান, ঘানা, তুরস্ক, মিসর, ভেনিজুয়েলা ও জিম্বাবুয়ের কথা বলেন তিনি।

১৯৯১-২০০২ সাল পর্যন্ত মুদ্রার ওঠানামার সঙ্গে ডলার-পেগড নীতি বজায় রেখেছিল আর্জেন্টিনা। তবে ২০০১ সালের বড় অংকের বিদেশী ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।

আর্জেন্টিনায় মুদ্রা সংকট এখন নিয়মিত ঘটনা। এর সমাধান হিসেবে প্রায়ই ডলারাইজেশনকে সামনে আনা হয়। ২০২৩ সালের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে জাভিয়ার মিলের প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে ছিল বিষয়টি। অবশ্য আর্জেন্টিনার অর্থমন্ত্রী লুইস কাপুটো সম্প্রতি স্বল্পমেয়াদে ডলারাইজেশন প্রয়োগের সম্ভাবনাকে বাতিল করেছেন। কারণ দেশটিতে পর্যাপ্ত ডলার রিজার্ভ নেই। তবে ডলারাইজেশনের ধারণাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি তিনি।

আর্জেন্টিনায় দেয়া ঋণের অর্থ ফেরত পেতে অনেকদিন ধরে কাজ করছেন হেজ ফান্ড এলিয়ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান জে নিউম্যান। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার মুদ্রা নিয়ে যে সমস্যা তা ভাঙতে চাইলে ডলারাইজেশনে যেতে হবে। প্রতিবার দেশটির অর্থনীতিতে ডলার ঢোকার পর তা অলিগার্ক এবং যাদের অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে তাদের মাধ্যমে বাইরে চলে যায়।’

একুয়েডর ও এল সালভাদরসহ অন্যান্য কিছু ছোট লাতিন আমেরিকান দেশ এখন বিনিময়ের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ডলার ব্যবহার করছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, দীর্ঘমেয়াদে ডলারাইজেশন আর্জেন্টিনাকে নিম্ন প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে। কারণ ডলারাইজেশন কার্যকর করলে দেশটিকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করতে হবে।

সম্প্রতি আঞ্চলিক নির্বাচনে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার মিলের দল আচমকা পরাজিত হয়। এরপর দেশটিতে রাতারাতি পেসো বিক্রি করে ডলার কেনার ঝোঁক বাড়লে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। পেসোর অবমূল্যায়নের মাধ্যমে নাজুক সামষ্টিক অর্থনৈতিক আরো হুমকিতে যায়। তবে আইনসভা নির্বাচনে মিলের দলের বড় জয়ে সেই অস্থিরতা কমে আসে।

আর্জেন্টিনায় ডলারে বন্ড ধারণকারীদের অনেকে মনে করেন, ডলারাইজেশন এখনো দূরবর্তী সম্ভাবনা। বিশেষ করে এটি ডলার রিজার্ভ বাড়ানোর ওপর নির্ভর করবে। পেসোকে নির্দিষ্ট বিনিময় হার সীমার মধ্যে রাখলে মুদ্রাটি শক্তিশালী থাকবে। এতে মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন হবে না। কিন্তু রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য পর্যাপ্ত ডলার প্রবাহ কমে যেতে পারে।

আরও